🏠︎ » বাংলাদেশ » আইন ও বিচার » ‘আশায় আছি, বিচার হবে’ ৩০ বছর পরও সালমান শাহর মায়ের অপেক্ষা

‘আশায় আছি, বিচার হবে’ ৩০ বছর পরও সালমান শাহর মায়ের অপেক্ষা

ঢাকাই সিনেমার জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর তিন দশক পেরিয়ে গেলেও ঘটনার রহস্য নিয়ে বিতর্কের অবসান হয়নি। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের নিজ ফ্ল্যাট থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে চারটি তদন্ত সংস্থা ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবেদন দিলেও তা মেনে নেয়নি তাঁর পরিবার।

দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর নতুন করে হত্যা মামলা হয়েছে। এরই মধ্যে মামলার আসামি খল-অভিনেতা মোহাম্মদ আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার, তদন্ত শেষ এবং মামলার বিচার শুরুর অপেক্ষায় সালমান শাহর পরিবার।

বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করা সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী বলেন, ‘আশায় আছি, মামলার তদন্ত শেষ হবে, বিচার হবে।’

তিনি বলেন, আসামিরা দেশে অবস্থান করলেও কেন তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না, তা তাঁর বোধগম্য নয়। নীলা চৌধুরীর প্রশ্ন, ইচ্ছাকৃতভাবে কি তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না? তাঁর দাবি, আসামিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে তারা দেশের বাইরে যেতে পারছেন না এবং দেশে থাকার কথা। তারপরও তাদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন।

সালমানের মা আরও বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসবে। দ্রুত সব আসামিকে গ্রেপ্তার করে মামলার তদন্ত শেষ করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

মামলার বাদী সালমান শাহর মামা আলমগীর কুমকুম বলেন, সালমান শাহ হত্যা মামলার বিচার শুধু পরিবারের সদস্যরা নন, দেশের মানুষও দেখতে চায়।

তিনি দাবি করেন, সালমান শাহ হত্যার সময় বাসায় সামিরা, ডলি, মনোয়ার ও বাসার কর্মচারী আবুল ছিলেন। তাদের গ্রেপ্তার করলে ঘটনার অনেক তথ্য বের হয়ে আসতে পারে বলে তাঁর মন্তব্য। সামিরাকে পুলিশ খুঁজে পাচ্ছে না দাবি করে তিনি বলেন, তাঁর সর্বশেষ স্বামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সামিরার অবস্থান জানা যেতে পারে। একইভাবে সামিরার মা লতিফা হক লুসি কোথায় আছেন, তা তাঁর বাবাকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে জানা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মোহাম্মদ আশরাফুল হক ডনের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে আলমগীর কুমকুম বলেন, রেজভী নামে এক আসামির বক্তব্যে ডনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি উঠে এসেছে। তিনি চান, সব আসামিকে গ্রেপ্তার করে দ্রুত মামলার বিচার শেষ করা হোক।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান বলেন, তদন্ত কার্যক্রম চলছে। ইতোমধ্যে একজন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এর বেশি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। এ বিষয়ে সিআইডির মিডিয়া সেলের মাধ্যমে তথ্য নেওয়ার পরামর্শ দেন মজিবুর রহমান।

বাদীপক্ষের আইনজীবী আবিদ হাসান বলেন, মামলাটি নিয়ে অনেক বছর পার হয়েছে। নতুন করে মামলা হওয়ায় তদন্ত দ্রুত শেষ করা এবং আসামিদের যত দ্রুত সম্ভব আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি আসামিদের শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানান।

অন্যদিকে, সালমান শাহ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা ডনের আইনজীবী এম ফরিদুল ইসলাম বলেন, মোবাইল ফোনে এ বিষয়ে কথা বলা সম্ভব নয়। চেম্বারে এলে তিনি বিস্তারিত জানাবেন।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনে নিজের ফ্ল্যাট থেকে সালমান শাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সে সময় তিনি দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা ছিলেন।

ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় প্রথমে অপমৃত্যুর মামলা করেন সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরে ছেলে হত্যার শিকার হয়েছেন—এমন অভিযোগ এনে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই অপমৃত্যুর মামলাকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন তিনি।

আদালত তখন অপমৃত্যুর মামলার পাশাপাশি হত্যার অভিযোগের বিষয়টিও তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেয়। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে জানায়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন।

সিআইডির প্রতিবেদনে অসন্তুষ্ট হয়ে কমরউদ্দিন চৌধুরী রিভিশন মামলা করেন। পরে ২০০৩ সালের ১৯ মে আদালত বিষয়টি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠায়।

এর প্রায় ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট মহানগর হাকিম ইমদাদুল হক বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। সেখানেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়।

তবে বিষয়টি সেখানেই থামেনি। সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী মামলাটি চালিয়ে যেতে থাকেন। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে ‘নারাজি’ দেন। একই সঙ্গে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে তাদের ছেলের হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার সম্ভাবনার কথা জানান।

পরে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় র‌্যাব। রাষ্ট্রপক্ষ আপত্তি জানালে ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ ৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েশ র‌্যাবকে মামলাটি আর তদন্ত না করার নির্দেশ দেন।

এরপর মামলার তদন্তভার যায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে। প্রায় চার বছর তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। এতে বলা হয়, ঘটনার সময় উপস্থিত ও ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৫৪ জন সাক্ষীর বক্তব্য বিশ্লেষণ এবং জব্দ আলামত পর্যালোচনা করেও হত্যার অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে সালমান শাহর ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পারিবারিক বিরোধ এবং স্ত্রী সামিরার কারণে মা নীলা চৌধুরীকে ছেড়ে থাকার মানসিক কষ্ট থেকে অভিমানী হয়ে সালমান আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন।

পিবিআইয়ের ওই প্রতিবেদনও মেনে নেননি নীলা চৌধুরী। তিনি ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে আরও তদন্তের দাবি জানান। পরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর পিবিআইয়ের প্রতিবেদন গ্রহণ করে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন।

এর পর সালমানের পরিবারের পক্ষ থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক সেই রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন।

আদালত সালমানের বাবা কমরউদ্দিনের অভিযোগ এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি সংযুক্ত করে হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে তদন্তেরও আদেশ দেওয়া হয়।

২০২০ সালে পিবিআই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়ার পর ডন বলেছিলেন, ‘আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। অবশেষে কলিজার বন্ধুকে হত্যার মিথ্যা অভিযোগ থেকে মুক্ত হলাম।’

তখন তিনি আরও বলেছিলেন, ‘২৪টা বছর বুকের ভেতর বন্ধু হত্যার মিথ্যা অপবাদ নিয়ে আমাকে ঘুরতে হয়েছে। আমার যে ক্ষতি হয়েছে তার পূরণ কিছুতেই হবে না। আমি ধৈর্য ধরে ছিলাম। সত্য কোনো দিন মিথ্যা হয় না। মিথ্যাকেও কোনো দিন জোর করে সত্যি বানানো যায় না।’

এর ছয় বছর পর সেই সালমান শাহ হত্যা মামলাতেই গ্রেপ্তার হলেন ডন।

সালমান শাহ হত্যা মামলায় সামিরা ও ডন ছাড়াও আসামির তালিকায় রয়েছেন সামিরার মা লতিফা হক লুসি, শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ফরহাদ। এ ছাড়া নাম উল্লেখ না করে আরও অনেককে মামলায় আসামি করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ