সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যানজটে নাকাল বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। নগরের কোথাও স্কুল ছুটির সময় গাড়ির দীর্ঘ সারি, কোথাও হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে রোগী ও স্বজনদের অপেক্ষমাণ যানবাহন। আবার শপিংমল ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সামনে ক্রেতাদের গাড়িতে সংকুচিত হয়ে পড়ছে সড়ক। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বাস, ট্রাকসহ অন্যান্য ভারী যানবাহন। ফলে নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যানজট এখন যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা।
একটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব গাড়ির চাপ সামাল দেওয়ার দায় যখন প্রতিষ্ঠানের সীমানা পেরিয়ে জনসাধারণের সড়কে এসে পড়ে, তখন এর খেসারত দিতে হয় পুরো নগরবাসীকে। নগরের বিভিন্ন এলাকায় পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় সড়কের ওপরই গাড়ি রাখার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও গাড়ি টেনে আনা অনেক প্রতিষ্ঠানই সেই চাপ সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কোথাও অনুমোদিত পার্কিংয়ের জায়গা দোকান, গোডাউন বা অন্য কাজে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। আবার কোথাও ভবনের নকশায় পার্কিংয়ের জায়গা দেখানো হলেও পরে বাস্তবে সেটি ভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
কিছু প্রতিষ্ঠানের পার্কিং ব্যবস্থা থাকলেও তা শুধু প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব গাড়ি রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে সেবা নিতে আসা মানুষের গাড়ি রাখার পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে সড়কের ওপর গাড়ি রাখছেন। এতে ব্যবসা ও সেবা কার্যক্রম চলছে ভবনের ভেতরে, কিন্তু সেই কার্যক্রমের অতিরিক্ত গাড়ির চাপ এসে পড়ছে সাধারণ মানুষের চলাচলের সড়কে।
নগরের ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সড়কের পাশে কিংবা সড়কের ওপর গাড়ি রাখার কারণে অনেক জায়গায় রাস্তার কার্যকর প্রস্থ কমে যাচ্ছে। কোথাও একাধিক সারিতে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকায় যানবাহন চলাচলের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। এতে স্বাভাবিক গতিতে যান চলাচল করতে না পারায় সামান্য চাপেই তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।
বিশেষ করে আগ্রাবাদ, দেওয়ানহাট, অলংকার, বন্দর, মাদারবাড়ী, মাঝিরঘাট, সদরঘাট, স্টেশন রোড, টাইগারপাস, নিউমার্কেট, কোতোয়ালি, আন্দরকিল্লা, লালদীঘির পাড়, জামালখান, কাজীর দেউড়ি, জুবিলী রোড, দামপাড়া, ওয়াসা, লালখান বাজার, বায়েজিদ, প্রবর্তক মোড়, চট্টেশ্বরী, মেহেদীবাগ, পাঁচলাইশ, গোলপাহাড়, জিইসি মোড়, ২ নম্বর গেট, মুরাদপুর ও নাসিরাবাদ এলাকায় যানবাহনের চাপ ও সড়কের ওপর গাড়ি রাখার কারণে দুর্ভোগ বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ষোলশহর, খুলশী, চকবাজার, কাপাসগোলা, বহদ্দারহাট, চান্দগাঁও, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, কালুরঘাট, রাহাত্তারপুল, বাকলিয়া, এক কিলোমিটার, শাহ আমানত সেতু, কর্ণফুলী, ফিরিঙ্গিবাজার, পাথরঘাটা, আসাদগঞ্জ, খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই, ফিশারিঘাট, দেওয়ানবাজার, বাকলিয়া এক্সেস রোড, কর্নেলহাট, সিটি গেট, সাগরিকা, পাহাড়তলী, আকবরশাহ, বিশ্বকলোনি, এ কে খান, সাগরপাড়, পতেঙ্গা, ইপিজেড, বন্দরটিলা, হালিশহর ও আগ্রাবাদ এক্সেস রোডসহ বিভিন্ন ব্যস্ত এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দীর্ঘদিন ধরে সড়কের ওপর গাড়ি রাখার অভিযোগ রয়েছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, শুধু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করলেই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। যেসব প্রতিষ্ঠান বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন নগরে টেনে আনছে, তাদের নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ভবনের অনুমোদিত নকশায় পার্কিংয়ের জন্য নির্ধারিত জায়গা অন্য কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটিও নিয়মিত তদারকির আওতায় আনা প্রয়োজন।
সড়ককে পার্কিং হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করা গেলে একদিকে যেমন যানজটের চাপ কমবে, অন্যদিকে নগরবাসীর স্বাভাবিক চলাচলও অনেকটা সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নগরের সড়ক যেন কোনো প্রতিষ্ঠানের বিকল্প পার্কিংয়ে পরিণত না হয় এ জন্য কার্যকর ও নিয়মিত অভিযান এবং কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী।