🏠︎ » বাংলাদেশ » অপরাধ » ত্রিশাল এলজিইডিতে ‘ঘুষ ছাড়া নড়ে না ফাইল’—ঠিকাদারদের অভিযোগ

ত্রিশাল এলজিইডিতে ‘ঘুষ ছাড়া নড়ে না ফাইল’—ঠিকাদারদের অভিযোগ

ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি: ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) অফিসে ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইল এগোয় না এমন অভিযোগ করেছেন একাধিক ঠিকাদার। তাদের দাবি, দরপত্রে অংশ নিয়ে লটারির মাধ্যমে কাজ পেলেও চুক্তি সম্পাদন, কার্যাদেশ গ্রহণ, বিল ছাড় এবং জামানতের টাকা উত্তোলন প্রতিটি ধাপেই ঘুষ দিতে বাধ্য করা হয়।

সম্প্রতি উপজেলা প্রকৌশলী যুবায়েত হোসেনের নামে হিসাব সহকারী কর্মকর্তা এনামুল হকের মাধ্যমে এক ঠিকাদারের কাছ থেকে ঘুষ দাবি করার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। গোপনে ধারণ করা ওই ভিডিওতে ঘুষের টাকার বিষয়ে কথোপকথন ধরা পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ঠিকাদারদের ভাষ্য, ত্রিশাল এলজিইডিতে প্রকৌশলীর দায়িত্বে যে-ই আসেন, ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইলের অগ্রগতি হয় না। এর আগে সাবেক উপজেলা প্রকৌশলী মুহাম্মদ শফিউল্লাহ খন্দকারের বিরুদ্ধেও প্রকল্প বরাদ্দের দুই শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগ ছিল, কমিশনের টাকা না দিলে বিল আটকে রাখা হতো এবং প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে বরাদ্দ আনতেও অতিরিক্ত অর্থ দিতে হতো।

এ অভিযোগ নিয়ে গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশের পর তিনি বদলি হন। এরপর ১৫ সেপ্টেম্বর ত্রিশালে যোগ দেন বর্তমান উপজেলা প্রকৌশলী যুবায়েত হোসেন। ঠিকাদারদের অভিযোগ, তার আমলেও একই ধরনের অনিয়ম চলছে। তবে এবার প্রকৌশলীর পক্ষে হিসাব সহকারী কর্মকর্তা এনামুল হক বরাদ্দের এক শতাংশ অর্থ সংগ্রহ করেন।

বর্তমানে উপজেলায় ৯টি নতুন স্কুল ভবন নির্মাণ, পাকা সড়ক নির্মাণ, প্রায় ৫০টি সড়ক সংস্কার এবং এডিপি ও রাজস্ব খাতের মোট ৩২টি প্যাকেজের কাজ চলমান রয়েছে। ঠিকাদারদের অভিযোগ, বরাদ্দের এক শতাংশ অর্থ না দিলে প্রকৌশলী বিল-ভাউচারে স্বাক্ষর করেন না। এমনকি জামানতের প্রায় ৬ লাখ টাকা ছাড় করাতেও ২০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তাদের আরও দাবি, সহকারী প্রকৌশলীরাও একইভাবে এক শতাংশ অর্থ দাবি করেন। অর্থ না দিলে কাজে নানা ত্রুটি দেখিয়ে বিলম্ব করা হয়। ফলে হয়রানি এড়াতে অনেক ঠিকাদার অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঘুষ দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

সম্প্রতি ফাঁস হওয়া প্রায় দুই মিনিটের ভিডিওতে দেখা যায়, এক ঠিকাদার প্রকৌশলীর জন্য হিসাব সহকারী এনামুল হককে পাঁচ হাজার টাকা দিতে চাইলে তিনি তা নিতে অস্বীকৃতি জানান। ভিডিওতে এনামুলকে বলতে শোনা যায়, “এই পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে আমি ছ্যাঁচড়া সাজতাম না। স্যারের কথা হলো, বিল আছে ২০ হাজার টাকাতেও এই ফাইল ছাড়ত না।” পরে তিনি আরও বলেন, “এটা নিলে আমাকে ছাড়ত না,বলে নিজের গলায় হাত দিয়ে ফাঁসির ইঙ্গিত করেন।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, বরাদ্দের এক শতাংশ ঘুষ না দিলে বিল ছাড় হয় না। তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের হয়রানির শিকার হয়ে এখন মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি দেওয়ার কথাও ভাবছেন।

ঠিকাদার এমদাদুল হক অভিযোগ করেন, মোক্ষপুর ইউনিয়নের সানকিভাঙ্গা-সাপখালী সড়ক সংস্কারকাজের সময় কার্পেটিং চলাকালে সহকারী প্রকৌশলীর মাধ্যমে কাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে রোলারসহ নির্মাণসামগ্রী নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়। পরে ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার পর কাজ চালানোর অনুমতি পান। বিল উত্তোলনের সময় আরও ৫০ হাজার টাকা এবং কাজ শেষে জামানতের টাকা তুলতে অতিরিক্ত ৮০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ঠিকাদার জানান, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় তার পাঁচটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এসব কাজ নির্বিঘ্নে পরিচালনার জন্য উপজেলা প্রকৌশলীকে দুই লাখ টাকার বেশি ঘুষ দিতে হয়েছে। পাশাপাশি সহকারী কর্মকর্তাদেরও আলাদা অর্থ দিতে হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার দাবি, এসব কারণে ঠিকাদারদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

এ বিষয়ে এলজিইডি ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী হুমায়ুন কবীর বলেন, ঠিকাদারদের কাছ থেকে বরাদ্দের বিপরীতে এক শতাংশ অর্থ নেওয়ার কোনো বৈধ নিয়ম বা নীতিমালা নেই।

অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী যুবায়েত হোসেন বলেন, তিনি কোনো ঠিকাদারের কাছ থেকে ঘুষ নেন না। হিসাব সহকারী এনামুল হকের ঘুষ দাবি করার ভিডিওর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভিডিওটি আমাকে দিন, আমি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।

অন্যদিকে হিসাব সহকারী এনামুল হকের কাছে প্রকৌশলীর নামে এক শতাংশ অর্থ নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে সাক্ষাতে কথা বলার অনুরোধ করেন। পরে অফিসে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে ফোন করলেও তিনি আর কল রিসিভ করেননি।

ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত সিদ্দিকী জানান, জুন ক্লোজিংয়ের সময় একাধিক ঠিকাদার তার কাছে মৌখিক অভিযোগ করেছেন। লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্তের জন্য এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ