কঠোর নজরদারি ও আইনি বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করে নতুন নতুন কৌশলে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে রোহিঙ্গারা। কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়াসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় স্থানীয় কতিপয় জনপ্রতিনিধি ও অসাধু সিন্ডিকেটের যোগসাজশে এই তৎপরতা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি এই অপতৎপরতার প্রতিবাদ করতে গিয়ে স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা চক্রটির হাতে নানাভাবে হয়রানি ও হুমকির শিকার হচ্ছেন।
পাসপোর্টে পুলিশ ভেরিফিকেশন শিথিল হওয়ার সুযোগ নিয়ে এই অসাধু চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তারা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের ভোটার করার বন্দোবস্ত করে দিচ্ছে। অতীতে তরুণ রোহিঙ্গা ছেলে-মেয়েরা স্থানীয়দের পিতা-মাতা বানিয়ে কিংবা ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে ভোটার হলেও, সম্প্রতি বয়োবৃদ্ধ রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার এক নতুন প্রবণতা দেখা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উখিয়ার রাজাপালং এবং টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নে দীর্ঘদিনের বসবাসের সুযোগ নিয়ে স্থানীয়দের সাথে মিশে গিয়ে বহু রোহিঙ্গা জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছে। অনেকেই কক্সবাজারের বাইরের জেলাগুলো থেকে ভুয়া পিতা-মাতা দেখিয়ে এনআইডি সংগ্রহ করেছে। পরবর্তীতে সেই আইডির সূত্র ধরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ম্যানেজ করে নিজেদের সন্তানদেরও ভোটার তালিকায় ঢোকাচ্ছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বয়স কমিয়ে বা বাড়িয়ে সুবিধা অনুযায়ী তথ্য পরিবর্তন করা হচ্ছে।
এমনই একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ও হ্নীলা ইউনিয়ন ঘিরে। শাহপরীর দ্বীপ বাজারপাড়া এলাকার বয়োবৃদ্ধ আমান উল্লাহ (বয়স আনুমানিক ৭০–৮০ বছর) সম্প্রতি ভোটার হওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তিনি একটি ওয়ারিশ সনদ নেন, যেখানে তাঁকে মৃত সোনা আলী ও মৃত ফরিদা খাতুনের সন্তান হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সনদে দাবি করা হয়, তাঁর কোনো ভাই-বোন বর্তমানে বেঁচে নেই।
অথচ তিনি ভোটার হওয়ার আবেদন করেছেন হ্নীলা ইউনিয়নের পশ্চিম লেদা গ্রাম থেকে। এ লক্ষ্যে ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ হ্নীলা ইউপি থেকে তিনি নাগরিক ও মৃত্যু সনদ, ভোটার তথ্য যাচাই প্রত্যয়ন এবং চাচা-ফুফুর এনআইডি নেই মর্মে অনাপত্তিপত্র সংগ্রহ করেন। এর আগে ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল একই ইউনিয়ন থেকে তাঁর নামে জন্ম নিবন্ধনও ইস্যু করা হয়।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—আমান উল্লাহ যদি প্রকৃতপক্ষেই শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা হন, তবে নিজ ইউনিয়ন বাদ দিয়ে হ্নীলা থেকে কেন এসব সনদ নেওয়া হলো? যেখানে ওই এলাকায় তাঁর নিজস্ব কোনো বসতভিটা বা হোল্ডিং পর্যন্ত নেই। সেখানে তাঁর ভাই-বোন না থাকার পরও চাচা-ফুফুর এনআইডি না থাকার প্রত্যয়ন কোন যুক্তিতে দেওয়া হলো, তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে আমান উল্লাহ (নিবন্ধন ফরম নং: ১২১৮০২০৬৭) এবং তাঁর মেয়ে নাহিদা সোলতানা নিহা (নিবন্ধন ফরম নং: ১২১৮০০৮৪৯) ছবি তোলার অপেক্ষায় রয়েছেন।
অপর এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, হ্নীলার বার্মাইয়া মৌলভী শামসুল আলম একজন চিহ্নিত রোহিঙ্গা হলেও তিনি কক্সবাজারের বাইরের এলাকা থেকে কৌশলে ভোটার আইডি কার্ড সংগ্রহ করেছেন। সেই আইডির সূত্র ধরে তাঁর ছেলে সাআদ (নিবন্ধন ফরম নং: ১২১৪২৫৩২০) এবং মেয়ে ফাহিমা আক্তার (নিবন্ধন ফরম নং: ১২১৪২৫০৯৪) হ্নীলার পশ্চিম পানখালী থেকে ভোটার নিবন্ধনের জন্য ছবি পর্যন্ত তুলেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আমান উল্লাহর মেয়ে সমিরা আক্তার বলেন, “আপনারা আমাদের বিষয়গুলো শুধু শুধু জটিল করছেন।” অন্যদিকে সাআদ ও ফাহিমা কোনো সদুত্তর না দিয়ে তাদের অভিভাবকদের সাথে কথা বলার অনুরোধ জানান।
লেদা ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হেলাল উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, “রোহিঙ্গা আমান উল্লাহ ভোটার আইডি করার জন্য মরিয়া হয়ে তদবির চালাচ্ছেন। বিগত সরকারের আমলে ভুয়া কাগজপত্রে তাঁর মেয়ে সমিরা আক্তার (এনআইডি: ৩৭৫৫৯১৭৬৯১), জমিলা আক্তার (এনআইডি: ৬৯১৩২৭৭৯৯৯) এবং ছেলে রিদুওয়ান (ভোটার নং: ২২১৮৯৪০০০৪৪৬) ভোটার হয়েছেন। এখন আবার তাঁদের বৃদ্ধ বাবাকে ভোটার করার চেষ্টা চলছে।” তিনি অবিলম্বে এই পরিবারের সব ভুয়া এনআইডি বাতিল এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
একই এলাকার বাসিন্দা কামরুল ইসলাম, আলী আকবর ও আব্দুল আমিন জানান, আমান উল্লাহর পরিবার বংশগতভাবেই মিয়ানমারের নাগরিক। স্থানীয় মেম্বার নুরুল হুদা আমান উল্লাহকে শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা দাবি করলেও তাঁর পূর্বপুরুষ যে মিয়ানমারের নাগরিক ছিলেন, তা স্বীকার করেছেন।
হ্নীলা ইউনিয়ন দক্ষিণ বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবসার কামাল ছিদ্দিকী বলেন, “আমান উল্লাহ একজন চিহ্নিত রোহিঙ্গা। জেনেশুনে কোনো রোহিঙ্গা পরিবারকে আমরা দেশের ভোটার হতে দিতে পারি না। তদন্ত সাপেক্ষে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তবে হ্নীলা ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হোসাইন আহমদ জানান, “আমার ওয়ার্ড থেকে কোনো রোহিঙ্গা ভোটার হতে পারেনি। সাআদ ও ফাহিমা চেষ্টা করলেও তাদের পিতা বাংলাদেশি না হওয়ায় আমি কোনো সহযোগিতা দিইনি। অতীতে কেউ জালিয়াতি করে থাকলে তা বাতিলে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. সালাহ উদ্দিন জানান, “রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার কোনো আইনগত সুযোগ নেই। কেউ যদি তথ্য গোপন করে বা জালিয়াতির মাধ্যমে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে, তবে তদন্ত সাপেক্ষে তা দ্রুত বাতিল করা হবে। এনআইডি সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির আসন্ন সভায় বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উত্থাপন করা হবে।”
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং এনআইডি সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি এস. এম. অনীক চৌধুরী বলেন, “রোহিঙ্গাদের কোনোভাবেই ভোটার তালিকায় ঠাঁই দেওয়া হবে না। এদেরকে ভোটার হতে সহায়তা করা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা চক্রের যেই জড়িত থাকুক, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তথ্য গোপন করে কেউ নিবন্ধিত হয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।