কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্যের মতো মানবমনের নেতিবাচক প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে প্রতীকী লড়াই। কোথাও মন্দিরের আড়ালে থাকা সেবকদের জীবনকথা, কোথাও মৃৎশিল্পীদের হাতে দেবী প্রতিমা গড়ার গল্প, আবার কোথাও দেশভাগের স্মৃতি ও শেকড়ের সন্ধান। চট্টগ্রামে এবারের দুর্গাপূজায় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মণ্ডপসজ্জায় উঠে এসেছে নানা সামাজিক ও মানবিক বার্তা। ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক ভাবনার সমন্বয়ে প্রতিটি মণ্ডপ যেন হয়ে উঠেছে ভিন্ন ভিন্ন গল্পের একেকটি মঞ্চ।
চট্টগ্রাম নগরী থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। ঢাকের বাদ্য, কাঁসরের ধ্বনি ও ধূপের সুবাসের সঙ্গে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করছে ব্যতিক্রমী থিম ও শৈল্পিক উপস্থাপনা। এসব আয়োজন দেখতে প্রতিদিনই বিভিন্ন মণ্ডপে ভিড় করছেন মানুষ। কোনো কোনো স্থানে দর্শনার্থীদের দীর্ঘ সারি কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে।
উত্তর কাট্টলীতে ‘রিপু রজনী’
চট্টগ্রাম নগরীর উত্তর কাট্টলী তালুকদার বাড়ির দুর্গাপূজার এবারের থিম ‘রিপু রজনী’। মানুষের অন্তর্নিহিত ছয়টি শত্রু—কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্যকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে মণ্ডপ। মানুষের ভেতরে ভালো-মন্দের দ্বন্দ্ব, আত্মসংযম এবং আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরাই এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) থেকে শুরু হওয়া এ পূজা দেখতে প্রতিদিনই দর্শনার্থীদের ব্যাপক সমাগম ঘটছে। ভিড় সামলাতে আয়োজকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। মূল মণ্ডপ থেকে দুই থেকে তিন কিলোমিটার পর্যন্ত দর্শনার্থীদের সারি দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আয়োজকদের একজন জুয়েল শীল বলেন, মানুষের মনের ভেতরে ভালো ও মন্দের নীরব দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। ষড় রিপু মানুষকে বারবার সত্য ও সুন্দরের পথ থেকে বিচ্যুত করে। সাময়িক সুখের আকাঙ্ক্ষায় অনেকে বিবেক ও আত্মশুদ্ধির কথা ভুলে যান। এসব ভাবনা থেকেই এবারের আয়োজনের নাম দেওয়া হয়েছে ‘রিপু রজনী’।
তবে দর্শনার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতির তুলনায় নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আয়োজকেরা। জুয়েল শীলের ভাষ্য, শুধু কয়েকজন আনসার সদস্য দিয়ে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের ভিড় সামলানো কঠিন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গ থেকে দর্শনার্থীরা আসছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় তাঁরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
পাথরঘাটায় ‘সাঁকো’, সামনে আসছে নেপথ্যের মানুষের গল্প
নগরীর কোতোয়ালি থানার পাশে পাথরঘাটা ষোড়শীকুঞ্জ সার্বজনীন পূজা উদযাপন পরিষদের এবারের থিম ‘সাঁকো’। মন্দিরের পুরোহিত থেকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী—যাঁদের শ্রমে প্রতিদিন মন্দিরের সেবামূলক কার্যক্রম সচল থাকে, তাঁদের জীবন ও অবদানকে ঘিরেই এ আয়োজন। সাধারণত আড়ালে থাকা এসব মানুষের কাজকে দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন আয়োজকেরা।
আয়োজকদের একজন বিপ্লব বসাক জানান, থিমটি বাস্তবায়নে প্রায় এক বছর ধরে কাজ করছেন তাঁরা। দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে জীবন্ত উপস্থাপনা। পাশাপাশি চট্টগ্রামের বিভিন্ন মন্দিরে সেবার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের ভিডিও ধারণ করে পর্দায় প্রদর্শনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
রাজাপুরে ‘মৃত্তিকায় চিন্ময়ী’, আগ্রাবাদে ‘ভার’
নগরের আন্দরকিল্লার রাজাপুর পূজা উদযাপন মৈত্রী সংসদ ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে উদ্যাপন করছে হীরকজয়ন্তী। এ উপলক্ষে তাদের এবারের আয়োজন ‘মৃত্তিকায় চিন্ময়ী’। দেবী প্রতিমা নির্মাণে কুমোরদের শ্রম, দক্ষতা ও সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দিয়ে সাজানো হয়েছে মণ্ডপ। মাটির প্রতিমায় দেবীর চিন্ময়ী রূপ ফুটিয়ে তোলার পেছনে যাঁদের অবদান রয়েছে, সেই শিল্পীদের কাজকে সামনে আনাই এ থিমের লক্ষ্য।
অন্যদিকে আগ্রাবাদ একতা গোষ্ঠীর থিম ‘ভার’। মানুষের জীবনের দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতার নানা দিক এতে তুলে ধরা হয়েছে। সন্তানের প্রতি বাবার দায়িত্ব, প্রকৃতির প্রতি মানুষের কর্তব্য কিংবা নিজের আত্মার প্রতি নিজের দায়—এসব বিষয়কে প্রতীকীভাবে উপস্থাপন করেছেন আয়োজকেরা।
দক্ষিণ নালাপাড়ায় ‘আত্মকথন’, জৈষ্ঠ্যপুরায় ‘বিকার বিবর্তন’
চট্টগ্রামের দক্ষিণ নালাপাড়ার দুর্গাপূজার এবারের ভাবনা ‘আত্মকথন’। ৭৯ বছরের পথচলায় জমে থাকা স্মৃতি, শেকড় ও ঐতিহ্যকে অতীত-বর্তমানের মেলবন্ধনে তুলে ধরা হয়েছে এ আয়োজনে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় যাত্রা শুরু করা পূজাটির দীর্ঘ ইতিহাস ও স্মৃতিকথা এবার বিশেষভাবে উপস্থাপন করছেন আয়োজকেরা।
এদিকে বর্তমান তরুণ সমাজের জীবনধারা ও পরিবর্তনশীল মানসিকতাকে উপজীব্য করে ‘বিকার বিবর্তন’ থিম নিয়ে এসেছে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার জৈষ্ঠ্যপুরার মৈত্রী সংঘ।
সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের এবারের দুর্গাপূজায় ধর্মীয় আবহের পাশাপাশি মানবিকতা, আত্মশুদ্ধি, দায়িত্ববোধ, শিল্পীদের অবদান, ঐতিহ্য ও সামাজিক পরিবর্তনের নানা দিক উঠে এসেছে। বৈচিত্র্যময় এসব থিম দর্শনার্থীদের শুধু আনন্দই দিচ্ছে না, ভাবনার খোরাকও জোগাচ্ছে।