ময়মনসিংহের ত্রিশাল-পোড়াবাড়ী সড়কটি অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই দফা সংস্কার হলেও স্থায়ী সমাধান মেলেনি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নিম্নমানের কাজের কারণে সংস্কারের কিছুদিন পরই সড়কে আবারও সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় খানাখন্দ। বর্তমানে সড়কের বেশকয়েকটি স্থানে গভীর গর্ত ও ভাঙাচোরা অংশের কারণে যানবাহন চলাচল প্রায় অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ সড়কে ত্রিশাল, ফুলবাড়িয়া ও টাঙ্গাইলের ঘাঁটাইল এলাকার মানুষ চলাচল করে। প্রতিদিন শতশত ভারী যানবাহন সহ ছোট বড় হাজারো যানবাহন চলাচল করে। তিন উপজেলার লাখো মানুষকে চলাচলের পথ এটি।
উপজেলা প্রকৌশল দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ সড়কটি উপজেলার অন্যতম ব্যস্ততম আঞ্চলিক সড়ক।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটির মেরামত কাজ বাস্তবায়ন করা হয়। ওই সময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিএম এন্টারপ্রাইজ সংস্কার কাজ সম্পন্ন করলেও এক বছরের মাথায় সড়কের বিভিন্ন স্থানে গর্ত ও খানাখন্দ দেখা দেয়।
পরবর্তীতে দীর্ঘদিন ভোগান্তির পর ২০২২-২৩ অর্থবছরে পুনরায় সড়কটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সর্বশেষ প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটির পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন ও সংস্কার কাজের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডিসিএল। কাজটি ২০২৩ সালের জুন মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নানা জটিলতায় তা নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। পরে ২০২৪ সালের শেষের দিকে এসে তারা কাজ শেষ করে। তবে বছর না পেরুতেই আবারও ভাংতে শুরু করে সড়কটি। বর্তমানে সড়কের ভাঙাচোরা অংশের খানাখন্দে চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়েছে সড়কটি।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। এসব স্থানে ছোট যানবাহনগুলো হেলেদুলে চলাচল করছে। কোনো কোনো যানবাহন গর্তে আটকে গিয়ে মারাত্মক ঝুঁকির সৃষ্টি করছে। আজ মঙ্গলবার একদিনেই সড়কের বেশ কয়েকটি স্পটে একাধিক মালবাহী যানবাহন গর্তে পড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আটকে থাকে।
গত কয়েকদিনে একাধিক ছোট যানবাহন উল্টে গিয়ে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো পার হতে অনেক যানবাহন যাত্রী নামিয়ে চলাচল করছে। এতে নারী, শিশু ও সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।

মৎস্য অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শত শত মাছ ও খাদ্যবাহী যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে পণ্য পরিবহনে ব্যাঘাত ঘটছে। গর্তে আটকে পড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে চালকদের। এতে ব্যবসায়ীরাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
স্থানীয় চলাচলকারী নূর মোহাম্মদ শুভ বলেন, “ত্রিশাল-পোড়াবাড়ী সড়কটির বর্তমানে বেহাল দশা। প্রতিদিন এ সড়কে হাজার হাজার গাড়ি চলাচল করে। খানাখন্দে সাধারণ মানুষ এখন চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছে। প্রশাসনের কাছে সড়কটি দ্রুত সংস্কারের দাবি জানাই।
স্থানীয় চলাচলকারী অধ্যাপক এনামূল হক বলেন, “মাত্র কিছুদিন আগে কাজটা শেষ করছে। মানুষ দুর্নীতিপরায়ণ হলেই কি এতো দুর্নীতিপরায়ণ হয়? এতো বড় গুরুত্বপূর্ণ একটা রাস্তা, অথচ আমাদের কত কষ্ট হচ্ছে। খাদ্যের গাড়ি নিয়ে আটকে যাচ্ছে, গর্ভবতী মহিলাদের ডাক্তারের কাছে নিয়া যাইতে সমস্যা হচ্ছে। আমরা যারা পদযাত্রী আছি তাদেরও কষ্ট হচ্ছে। বারবার সংস্কার হলেও তা টেকসই হয়নি। আমরা দ্রুত মানসম্মত ও স্থায়ী সংস্কার কাজ চাই।”
অটোরিকশা চালক আলামিন বলেন, “প্রতিদিন জীবিকার তাগিদে এই সড়কে চলাচল করতে হয়। বড় বড় গর্তে পড়ে গাড়ির যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে, মেরামতে অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে। অনেক সময় যাত্রীদের নামিয়ে ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি পার করতে হয়। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বেড়ে গেছে।”
ট্রাক চালক আশিক মিয়া বলেন, “মাছ ও খাদ্যবাহী ট্রাক নিয়ে এই সড়কে চলাচল করা এখন খুবই কষ্টকর। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো যানবাহন গর্তে আটকে যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়। এতে ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।”
উপজেলা প্রকৌশলী যুবায়েত হোসেন বলেন, “আমি এখানে যোগদান করেছি প্রায় ১০ মাস আগে। এর আগে সড়কের সংস্কারকাজ কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারব না। তবে বর্তমানে সড়কের কয়েকটি স্থানে খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। এগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের জন্য আমরা নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছি। নতুন অর্থবছর শুরু হলেও মোবাইল মেইনটেন্যান্স খাতের বরাদ্দ এখনো পাওয়া যায়নি। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকেও অবহিত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে সড়কটি আরও টেকসই করতে ভারী যানবাহনের চাপ সহনীয় ‘হেভি ডিজাইন’ ও অতিরিক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা সংযোজনের বিষয়টি পরবর্তী সভায় উপস্থাপন করা হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরাফাত সিদ্দিকী বলেন, “এটি এলজিইডির রাস্তা। রাস্তাটির এখনো মেচিউরড পিরিয়ডই শেষ হয়নি। তিন বছরের আগে তারা সার্ভিস করতে পারে না। দুই বছরের মাথায়ই নষ্ট হওয়ায় পরিস্থিতি এতোটাই খারাপ হয়েছে এখন সবাই প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছে। যাইহোক পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে জরুরি ভিত্তিতে এখন আমরা ভাঙা অংশটুকু মেরামতের জন্য ত্রিশাল ইউনিয়ন এবং মঠবাড়ী ইউনিয়নের প্রশাসক বরাবরে তিন লক্ষ টাকা করে মোট ছয় লক্ষ টাকার দুইটি পিআইসি প্রকল্পের বরাদ্দের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এটা দিয়ে আশা করছি আগামী সপ্তাহের মধ্যে সংস্থার কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।”
আবু রাইহান, ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি