চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংকট দেখা দিয়েছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) শয্যায়। গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের জন্য জরুরি সময়ে আইসিইউ না পাওয়ায় বাড়ছে উদ্বেগ। স্বজনদের অভিযোগ, অনেক চেষ্টা করে শয্যা পাওয়া গেলেও দেরির কারণে শেষ পর্যন্ত রোগীকে বাঁচানো যাচ্ছে না। খোরশেদুল আলম, পাঁচ বছরের আনিশা নাথ ও সাত বছরের অনুশ্রী দাশের মৃত্যুর ঘটনায় সামনে এসেছে এ সংকটের চিত্র।
ফটিকছড়ি পৌর এলাকার ৩৬ বছর বয়সী মো. খোরশেদুল আলমের প্রথমে তীব্র জ্বর দেখা দেয়। এক দিন পর শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। তিন দিনেও জ্বর না কমায় পরীক্ষা করে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। গত শুক্রবার তাঁকে চট্টগ্রাম নগরীর সিএসসিআর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে দ্রুত প্লাটিলেট কমে গেলে চিকিৎসকেরা তাঁকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজ করেও সময়মতো শয্যা পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে একটি শয্যার ব্যবস্থা হলেও সেখানে নেওয়ার পথেই গত শনিবার মারা যান তিনি।
খোরশেদুলের বড় ভাই তৌহিদুল আলম বলেন, শুক্রবার সকালে হাসপাতালে ভর্তির এক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর ভাইয়ের অবস্থার অবনতি হয়। চিকিৎসকেরা জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ প্রয়োজন বলে জানান। কিন্তু সিএসসিআর হাসপাতালে শয্যা খালি না থাকায় স্বজন ও পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন তাঁরা। পরে এক ঘনিষ্ঠজনের সহায়তায় মা ও শিশু হাসপাতালে শয্যা পাওয়া গেলেও সেখানে পৌঁছানোর আগেই খোরশেদুলের মৃত্যু হয়।
বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১৫টি উপজেলা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ৪১টি ওয়ার্ডে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। গত মঙ্গলবার ডেঙ্গু আক্রান্ত ১০৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং দুজনের মৃত্যু হয়। বুধবার আক্রান্ত হন ৯৮ জন, ওই দিনও মারা যান দুজন।
চলতি মাসের প্রথম ১৪ দিনে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৩০০। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে সাতজনের। প্রতিদিন গড়ে ৯০ থেকে ১০০ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে ২০ থেকে ৩০ জনের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এসব গুরুতর রোগীর চিকিৎসায় আইসিইউ প্রয়োজন হলেও শয্যা সংকটে স্বজনদের এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে। চলতি বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৭৫৪ জনে; মৃত্যু হয়েছে ২৮ জনের।
সরকারি হাসপাতালে সীমিত আইসিইউ সুবিধা
সরকারি পর্যায়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ৬০টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের সংকটাপন্ন রোগীদের এসব শয্যায় চিকিৎসা দেওয়া হয়। কোনো শয্যা খালি হলে বা রোগী স্থানান্তরিত হলে নতুন রোগী ভর্তির সুযোগ তৈরি হয়।
নগরীর কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা থাকলেও শুধু শয্যার জন্য প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়। ফলে অনেক ডেঙ্গু রোগীর স্বজন সরকারি চমেক হাসপাতালের ওপর নির্ভর করছেন।
আইসিইউ শয্যা না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে শিশুদের ক্ষেত্রেও। চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর ১ নম্বর শেড হিন্দুপাড়ার বাসিন্দা মিথুন নাথের পাঁচ বছরের মেয়ে আনিশা নাথ গত শনিবার মারা যায়। একইভাবে সাত বছরের শিশু অনুশ্রী দাশেরও আইসিইউ শয্যা না পাওয়ার কারণে মৃত্যু হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
আনিশার বাবা মিথুন নাথ বলেন, গত ৬ অক্টোবর তাঁর মেয়ের জ্বর আসে। গত শুক্রবার মধ্যরাত থেকে শিশুটি অস্থির হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা আইসিইউতে ভর্তির পরামর্শ দিলেও কোনো শয্যা খালি ছিল না। প্রায় এক দিন বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগের পর একটি শয্যার ব্যবস্থা হয়। কিন্তু সেখানে ভর্তির তিন ঘণ্টার মধ্যে শনিবার সকালে আনিশার মৃত্যু হয়। আগে শয্যা পাওয়া গেলে মেয়েকে বাঁচানো সম্ভব হতো বলে মনে করেন তিনি।
চাপ সামলাতে হিমশিম হাসপাতালগুলো
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম আজাদ জানান, তাঁদের হাসপাতালে শিশু ও বয়স্ক রোগীদের জন্য মোট ৭০টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। প্রতিদিনই শয্যার জন্য অনেকেই ফোন করছেন। গত কয়েক দিন ধরে রোগীর চাপ এত বেশি যে কোনো শয্যাই খালি থাকছে না।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত অনেক রোগীর আইসিইউ প্রয়োজন হচ্ছে। কিন্তু শয্যা সংকটের কারণে জরুরি মুহূর্তে প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ডেঙ্গুর সংক্রমণ কমাতে মশা নিধনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
এদিকে ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, ডেঙ্গুর হটস্পটগুলোতে মশক নিধন, লার্ভা ধ্বংস, ওষুধ প্রয়োগ ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় রোগীদের জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইসিইউ শয্যার সংকট মোকাবিলা এবং মশক নিধন কার্যক্রম আরও কার্যকর করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।