দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন—এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতার নাম আলোচনায় থাকলেও সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম।
রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা, ব্যক্তিত্ব ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে দল ও দলের বাইরে মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
কেন আলোচনায় মির্জা ফখরুল
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, দল পরিচালনায় অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুলের ভূমিকা তাকে রাষ্ট্রপতি পদের আলোচনায় এগিয়ে রেখেছে।
বিএনপির দীর্ঘ দুঃসময়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া এবং দলের রাজনৈতিক বার্তা দেশ-বিদেশে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক অঙ্গনে শালীন বক্তব্য ও তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের কারণে দলীয় গণ্ডির বাইরেও তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বলে মনে করেন অনেকে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, রাষ্ট্রপতি পদটি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে একটি সাংবিধানিক পদ। তাই এমন একজন ব্যক্তিকে এ পদে বসানো প্রয়োজন, যিনি রাজনৈতিকভাবে অভিজ্ঞ হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন মহলে গ্রহণযোগ্য এবং সংকটময় সময়ে ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

তিন কারণে এগিয়ে
মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদের আলোচনায় এগিয়ে রাখার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে আসছে—তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা।
দলের কঠিন সময়ে নেতৃত্ব দেওয়া এবং বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি দীর্ঘদিনের আস্থার কারণে দলের অনেক নেতাকর্মীর কাছেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। রাষ্ট্রপতির মতো সাংবিধানিক ও মর্যাদাপূর্ণ পদে তার ধীরস্থির ব্যক্তিত্বও ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে রাষ্ট্রপতি হওয়ার বিষয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন
১৯৪৮ সালে ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অধিকারী। তার বাবা রুহুল আমিন (চখা মিয়া) কৃষি প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। বড় চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ভূমিমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের স্পিকারসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
মির্জা ফখরুল ১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন এবং ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন।
১৯৭৯ সালে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এসএ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। পরে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
দলের মহাসচিব হিসেবে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করে আসা মির্জা ফখরুল বিএনপির বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
বিশ্লেষকদের মত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি নতুন সরকার গঠন করলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে এমন কাউকে চাইবে, যিনি রাজনৈতিকভাবে অভিজ্ঞ, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এবং রাষ্ট্রের সংকটময় মুহূর্তে ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম সেলিম বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা, প্রজ্ঞা, আনুগত্য, সততা ও সাহসিকতার বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. স ম আলী রেজা বলেন, বিএনপিতে রাষ্ট্রপতি হওয়ার মতো বেশ কয়েকজন বর্ষীয়ান নেতা রয়েছেন। তবে শারীরিক সক্ষমতা ও সংকটকালে প্রাজ্ঞ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতার বিবেচনায় বিএনপি মহাসচিবকে যোগ্যতম মনে করেন তিনি।
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক বলেন, রাষ্ট্রপতি পদে এমন একজনকে প্রয়োজন, যিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং সংবিধান, আইন ও রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে প্রস্তুতি
এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার প্রস্তুতিও শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। নিয়ম অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তপশিল ঘোষণার আগে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ কমিশনাররা ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
ইসি সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আইন ও ভোটার তালিকা নিয়ে এরই মধ্যে কমিশনে আলোচনা হয়েছে। সংসদ সচিবালয় থেকে সংসদ সদস্যদের তালিকা পাওয়ার পর সেটির ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা হবে। এরপর ঘোষণা করা হবে নির্বাচনের তপশিল।
সব মিলিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা এখন তুঙ্গে। তবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকলেও বিএনপির আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত বিষয়টি নিশ্চিত নয়।