ঢাকা: দেশের চা খাতকে শিল্পের পরিবর্তে কৃষি খাত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে সরকারের গঠিত উচ্চপর্যায়ের বিশেষ টাস্কফোর্স। একই সঙ্গে ভ্যাট ও কর কমানো, স্বল্পসুদে কৃষিঋণের সুবিধা, বিশেষ সহায়তা তহবিল গঠন, রপ্তানি সম্প্রসারণ, পুনঃরোপণ কর্মসূচি এবং শ্রমিক কল্যাণ নিশ্চিতসহ খাতটির উন্নয়নে একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চা শিল্পের সার্বিক উন্নয়ন নিয়ে একটি বিশেষ বৈঠক আহ্বান করেছেন। ওই বৈঠকে টাস্কফোর্সের সুপারিশগুলো পর্যালোচনা ও বাস্তবায়নের বিষয়টি আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
চা উৎপাদন বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা, বাংলাদেশের নিজস্ব ব্র্যান্ড গড়ে তোলা এবং বৈশ্বিক বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে গত জুনে সরকার ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করে। ন্যাশনাল টি কোম্পানির চেয়ারম্যান মামুন রশীদের নেতৃত্বে গঠিত এ কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম চা উৎপাদনকারী দেশ। ২০২৫ সালে দেশের ১৭২টি চা বাগানে মোট ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৩০ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। এ খাতে সরাসরি প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার শ্রমিক কাজ করছেন। এছাড়া প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ চা বাগান এলাকায় বসবাস করেন এবং সারাদেশে লক্ষাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও চায়ের দোকান এ খাতের ওপর নির্ভরশীল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কম দামে চা বিক্রি হওয়ায় খাতটি বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। ২০১৯ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন খরচের নিচে চা বিক্রি হচ্ছে। ২০২৪ সালে প্রতি কেজি চা উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে ২৬০ টাকা, অথচ নিলামে গড় বিক্রিমূল্য ছিল মাত্র ২০৮ দশমিক ৮৮ টাকা। এছাড়া ২০০২ সালের তুলনায় দেশের চা রপ্তানি প্রায় ৭৯ শতাংশ কমে গেছে।
টাস্কফোর্স সংকটের পেছনে ছয়টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে চা খাতকে কৃষি নয়, শিল্প হিসেবে শ্রেণিভুক্ত রাখাকে। ফলে চা বাগানগুলো কৃষিখাতের স্বল্পসুদে ঋণ, ভর্তুকিযুক্ত সার এবং শস্য বিমার মতো সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বর্তমানে কৃষিঋণের সুদের হার ৬ শতাংশ হলেও চা বাগানগুলোকে ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, কৃষিখাতের সমান সুদে ঋণের সুযোগ পেলে বছরে প্রায় ৬১৭ কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব।
এ ছাড়া ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ১ শতাংশ বিশেষ কর, ১ শতাংশ ব্রোকারেজ, গুদামজাতকরণ ব্যয় এবং সরাসরি বিক্রির ওপর অগ্রিম আয়করের চাপ উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রধান চা উৎপাদনকারী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের চায়ের ওপর আরোপিত ভ্যাট সবচেয়ে বেশি। একই সঙ্গে রপ্তানি আয় কমে বছরে মাত্র ২৫ থেকে ৪৫ লাখ মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে। পাকিস্তান ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান নেই। পাশাপাশি দেশের চায়ের কোনো জাতীয় ব্র্যান্ড কিংবা ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) নিবন্ধনও হয়নি।
উৎপাদনশীলতার দিক থেকেও বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশে প্রতি হেক্টরে গড় ফলন ১ হাজার ৫৫০ কেজি, যা ভারত ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। অনেক চা বাগানে প্রায় ৪০ শতাংশ গাছ অনুপস্থিত এবং মাটির জৈব উপাদানের পরিমাণও কমে গেছে। এছাড়া চা বাগানের মোট ২ লাখ ৯৪ হাজার ১৪২ একর জমির প্রায় ৪৫ শতাংশে চা উৎপাদন হয় না। টাস্কফোর্সের মতে, এর একটি অংশে নতুন বাগান স্থাপন এবং অবশিষ্ট জমি পর্যটন, সৌরবিদ্যুৎ কিংবা উচ্চমূল্যের কৃষি উৎপাদনে ব্যবহার করা যেতে পারে।
খাতটির উন্নয়নে মোট ৫৯টি সুপারিশ করা হলেও এর মধ্যে ১০টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে—চা খাতকে কৃষি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামানো, ২ হাজার ৫০ কোটি টাকার বিশেষ সহায়তা তহবিল গঠন, গুণগত মানভিত্তিক তিন স্তরের ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ, ১০ বছর মেয়াদি পুনঃরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন, পাকিস্তান, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও রাশিয়ার সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে রপ্তানি চুক্তি, বিডায় ‘টি ইনভেস্টমেন্ট ডেস্ক’ স্থাপন, গ্রিন ফিন্যান্সের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ ও আধুনিক সেচব্যবস্থায় বিনিয়োগ, পঞ্চগড়ে চা বোর্ডের আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপন এবং শ্রমিকদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাকে বাধ্যতামূলক কল্যাণ কর্মসূচির আওতায় আনা।
প্রতিবেদনে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য ৯০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনাও দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন, ৬০ দিনের মধ্যে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে চাকে কৃষি খাত হিসেবে স্বীকৃতি এবং ৯০ দিনের মধ্যে রপ্তানি আলোচনা শুরু, বিডায় বিনিয়োগ ডেস্ক চালু ও পঞ্চগড়ে চা বোর্ডের আঞ্চলিক অফিস স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
মামুন রশীদের নেতৃত্বে প্রস্তুত করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চা খাত কেবল একটি অর্থনৈতিক খাত নয়; এটি লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা, কর্মসংস্থান ও জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই খাতটির টেকসই উন্নয়নে দ্রুত ও কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।