ময়মনসিংহ অফিস :
মাত্র ১৫ গজের ব্যবধান। এক পাশে মসজিদ, অন্য পাশে মন্দির। মসজিদে আজান হলে থেমে যায় পূজার ঢাকের বাজনা। নামাজ শেষ হলে আবারও শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। এভাবেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও সম্প্রীতি বজায় রেখে যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি চলছে দুই ধর্মের উপাসনা। কারও প্রতি কারও অভিযোগ নেই, নেই ধর্ম পালনে কোনো বাধা। এমনই সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত রয়েছে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা শহরের কলেজ রোড এলাকায়।
ময়মনসিংহ জেলায় এ বছর ৮১৮টি মণ্ডপে উদযাপিত হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। জেলার উপজেলাগুলোর মধ্যে মুক্তাগাছায় সবচেয়ে বেশি ১১৫টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম কলেজ রোড এলাকার শ্রীশ্রী গোপাল ও তিন শিব মন্দির। মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাকাল ১৭৯২ সাল। দীর্ঘদিন ধরে এখানে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে আসছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
মন্দিরের পাশেই মাত্র ১৫ গজের ব্যবধানে রয়েছে কলেজ রোড জামে মসজিদ। ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত এ মসজিদে নিয়মিত জামাতে নামাজ আদায়সহ অন্যান্য ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি দুটি উপাসনালয় থাকলেও কখনো ধর্ম পালনে বড় ধরনের কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয়নি। বরং পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক।
মসজিদে নামাজের সময় পূজামণ্ডপে ঢাকঢোলসহ শব্দ সৃষ্টিকারী কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। আজানের সময়ও বন্ধ থাকে পূজার বাদ্যযন্ত্র। নামাজ শেষ হলে আবারও শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই হয়ে উঠেছে সম্প্রীতির উজ্জ্বল উদাহরণ।
শ্রীশ্রী গোপাল ও তিন শিব মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক লিমন সাহা বলেন, মসজিদ প্রতিষ্ঠার দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও মন্দিরে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনে কোনো সমস্যা হয়নি। এবারও নির্বিঘ্নে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন করা হচ্ছে। নামাজের সময় মন্দিরে নীরবতা বজায় রাখা হয়। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন। ধর্ম যার যার, উৎসব সবার—এমন বিশ্বাস থেকেই তাঁরা সম্প্রীতি বজায় রেখে চলছেন।
কলেজ রোড জামে মসজিদের কোষাধ্যক্ষ দুলাল উদ্দিন বলেন, মসজিদ ও মন্দির পাশাপাশি থাকলেও তাঁদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। নামাজের সময় পূজার কার্যক্রম ও ঢাকের বাজনা বন্ধ রাখা হয়। ফলে নামাজ আদায়ে কোনো অসুবিধা হয় না। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে তাঁদের সুসম্পর্ক রয়েছে। পারস্পরিক সহযোগিতা ও শ্রদ্ধার মধ্য দিয়েই তাঁরা একসঙ্গে বসবাস করছেন।
মুক্তাগাছা উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক ডা. ভাস্কর সাহা কল্লোল বলেন, মন্দিরের পাশে মসজিদ থাকলেও পূজা উদযাপনে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। মুসলিম সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকেও কোনো অভিযোগ নেই। বরং দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভালো সম্পর্ক ও সম্প্রীতি বজায় রয়েছে।
সমাজের সচেতন মানুষ মনে করেন, ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহযোগিতার মাধ্যমে যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব, মুক্তাগাছার এই মসজিদ-মন্দির তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বিভেদের পরিবর্তে সম্প্রীতির এই চর্চা সমাজের অন্যদের জন্যও হতে পারে অনুসরণীয়।