ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, নিজেদের সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করেই সবাইকে একটি স্বাস্থ্যকর শহর গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
সোমবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান কার্যালয় নগর ভবন পরিদর্শনকালে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সবার কথা বাদ দেন, নিজের সন্তানের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, একটি স্বাস্থ্যকর শহর গড়ে তুলি। আসুন, আমরা সবাই মিলে সেই চেষ্টা করি।”
সন্তানদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য পরিচ্ছন্ন পরিবেশের গুরুত্ব তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, কোনো অভিভাবকই চান না তাঁর সন্তান নোংরা, জীবাণুযুক্ত ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বড় হোক। শিশুরা শুধু নিজেদের বাসার আশপাশে থাকে না; স্কুল, কলেজ, খেলার মাঠসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করে। তাই শুধু নিজের এলাকা নয়, পুরো শহর পরিষ্কার রাখার বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
পরিচ্ছন্ন ঢাকা গড়তে প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা শহরের অন্যতম বড় সমস্যা আবর্জনা ও অপরিচ্ছন্নতা। এ সমস্যা এক দিন বা সাত দিনের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সংশ্লিষ্ট সবাই আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে গেলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো সম্ভব।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তাঁরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নগরীর পরিচ্ছন্নতা সমস্যা সমাধানের সঙ্গে যুক্ত। পরিবর্তন আনতে সময় লাগতে পারে, তবে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সদিচ্ছা ও আত্মবিশ্বাস।
কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, তিনি বিভিন্ন স্থানে গিয়ে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারাও একইভাবে সমস্যাগুলো শনাক্ত করে সমাধানে উদ্যোগী হলে নগরীর চিত্র বদলানো সম্ভব।
লন্ডনের উদাহরণ দিয়ে আশাবাদ
ঢাকার পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতির উন্নয়নে যুক্তরাজ্যের লন্ডন শহরের উদাহরণ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ষাট ও সত্তরের দশকেও লন্ডনের বিভিন্ন এলাকায় ময়লা-আবর্জনার সমস্যা ছিল। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা ও নাগরিক সচেতনতার মাধ্যমে শহরটির পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে।
বিদেশের পরিচ্ছন্ন শহর দেখে দেশে ফিরে শুধু আফসোস না করে নিজেদের দায়িত্ব পালনের ওপর জোর দেন তিনি। তাঁর মতে, সম্মিলিত উদ্যোগ ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে বাংলাদেশেও পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তোলা সম্ভব।
ঢাকার পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতিতে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে সাম্প্রতিক কথোপকথনের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। ওই ব্যক্তি ঢাকার পরিবর্তন সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকায় অনেক পরিবর্তন হয়েছে—এমন দাবি তিনি করেননি; বরং আগের তুলনায় কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এই অগ্রগতিই প্রমাণ করে যে চেষ্টা অব্যাহত রাখলে আরও ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।
নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করার কথাও জানান তিনি। কোথাও সড়ক বিভাজক নির্মাণ এবং কোথাও বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রের অবস্থার উন্নতির মতো উদ্যোগগুলো অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আত্মসমালোচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অন্যের সমালোচনা করার পাশাপাশি নিজেদের দায়িত্ব কতটা সঠিকভাবে পালন করা হচ্ছে, তা নিয়েও ভাবতে হবে। নিজের কাজের মূল্যায়ন করে আরও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি।
নগর ভবনের জরুরি পরিচালন কেন্দ্র পরিদর্শন
মতবিনিময় সভার আগে প্রধানমন্ত্রী নগর ভবনের জরুরি পরিচালন কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি আবহাওয়ার তথ্য, যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) ভূমিকম্পসংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য, বাতাসের গতিবেগ, বন্যার পূর্বাভাস ও বায়ুর মান পর্যবেক্ষণের বিভিন্ন ওয়েবসাইট দেখেন। জরুরি পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণের পদ্ধতি নিয়েও খোঁজখবর নেন তিনি।
এ ছাড়া ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে নগরীর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন প্রধানমন্ত্রী। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর উন্নয়ন ও বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে তৈরি একটি ভিডিওচিত্রও দেখেন তিনি।
এ সময় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব শহীদুল হাসান উপস্থিত ছিলেন।