🏠︎ » সারাদেশ » রংপুর » পাঁচ আবহাওয়া রাডারের চারটিই অচল, দুর্যোগ পূর্বাভাসে বাড়ছে ঝুঁকি

পাঁচ আবহাওয়া রাডারের চারটিই অচল, দুর্যোগ পূর্বাভাসে বাড়ছে ঝুঁকি

দেশজুড়ে একদিকে তাপপ্রবাহ, অন্যদিকে ভারী বর্ষণ ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা বাড়ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু এখন সারা দেশে সক্রিয় থাকায় বিভিন্ন এলাকায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি, বজ্রঝড় এবং দমকা হাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত ও নির্ভুল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের জন্য রাডার ব্যবস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেও দেশের পাঁচটি আবহাওয়া রাডারের মধ্যে বর্তমানে সচল রয়েছে মাত্র একটি।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, রংপুর, মৌলভীবাজার, কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় স্থাপিত পাঁচটি ডপলার আবহাওয়া রাডারের মধ্যে কেবল ঢাকার রাডারটি কার্যকর রয়েছে। বাকি চারটি বিভিন্ন সময় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অচল হয়ে পড়েছে। ফলে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল এবং কক্সবাজার উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যকর রাডার পর্যবেক্ষণের বাইরে চলে গেছে।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। এমন সময়ে রাডার নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়া শুধু আবহাওয়া পূর্বাভাস নয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকেও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলছে। সময়মতো ঝড়, বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি কিংবা ভারী বর্ষণের তথ্য না পাওয়া গেলে মানুষের জীবন, কৃষি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ে।

সবচেয়ে আলোচনায় রয়েছে রংপুরের নতুন আবহাওয়া রাডার। দীর্ঘ ১২ বছর অপেক্ষার পর গত বছরের মে মাসে এটি চালু হলেও চলতি বছরের ১৭ জুন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আবারও বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে ২০১২ সালে রংপুরের পুরোনো রাডার পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়েছিল। নতুন রাডারটি প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার এলাকা পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম ছিল এবং বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের কয়েকটি সীমান্তবর্তী অঞ্চল, নেপাল, ভুটান ও তিব্বতের আবহাওয়ার তথ্যও সংগ্রহ করতে পারত।

রংপুর আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, রাডারটির ত্রুটি নিরসনে জাপানের একটি কারিগরি দল বাংলাদেশে এসেছে। তারা শিগগিরই রংপুরে গিয়ে প্রয়োজনীয় মেরামতের কাজ শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, মৌলভীবাজারের রাডার দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকায় সিলেট বিভাগের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা, ভারী বর্ষণ এবং বজ্রপাতের আগাম তথ্য সংগ্রহে এর প্রভাব পড়ছে।

উপকূলীয় এলাকাতেও একই ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। কক্সবাজারের রাডার প্রায় তিন বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬০ ফুট উঁচু পাহাড়ে স্থাপিত এই রাডারটি বঙ্গোপসাগরের প্রায় ৪০০ কিলোমিটার এলাকার আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করতে পারত। বর্তমানে এটি অচল থাকায় সমুদ্রগামী জেলে ও উপকূলবাসীর জন্য আগাম সতর্কতা দেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।

পটুয়াখালীর খেপুপাড়া রাডারও প্রায় আট বছর ধরে বন্ধ। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এটি অচল হওয়ার পর আর চালু করা সম্ভব হয়নি। আগে এই রাডারের মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ, বৃষ্টিপাতের তীব্রতা এবং উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য জরুরি সতর্কতা প্রদান করা হতো।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বেশির ভাগ রাডারের যন্ত্রাংশ অনেক পুরোনো। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব যন্ত্রাংশ আর পাওয়া যায় না। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই মেরামতের পরিবর্তে সম্পূর্ণ নতুন রাডার ব্যবস্থা স্থাপনের প্রয়োজন হচ্ছে।

আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষকদের মতে, আধুনিক ডপলার রাডার প্রতি কয়েক মিনিট পরপর মেঘের গতি, বৃষ্টিপাতের বিস্তার, শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা, বজ্রঝড়ের অবস্থান এবং বাতাসের গতিবেগ সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগের নির্ভুল পূর্বাভাস দিতে নিজস্ব রাডার নেটওয়ার্কের কোনো বিকল্প নেই।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, নতুন রাডার স্থাপনের জন্য একটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, জাপানের অর্থায়নে কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন তিনটি অত্যাধুনিক রাডার সিস্টেম স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ নতুন রাডারগুলো চালু করা সম্ভব হবে। নতুন প্রযুক্তির এসব রাডারের কার্যক্ষমতা ও আয়ুষ্কাল আগের তুলনায় আরও উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ