🏠︎ » মতামত » সক্ষমতার বড় পরীক্ষা: উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কতটা প্রস্তুত সরকার ?

সক্ষমতার বড় পরীক্ষা: উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কতটা প্রস্তুত সরকার ?

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর মাধ্যমে আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ৮৭ শতাংশ। এমন উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা দিলেও, বর্তমান বাস্তবতায় তা অর্জন কতটা সম্ভব—সে প্রশ্ন সামনে এসেছে।

চলতি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অর্থবছর শেষে এই ঘাটতি প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমন অবস্থায় আগামী অর্থবছরে আরও বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করাকে অনেকেই কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।

রাজস্ব বাড়াতে সরকার কয়েকটি সংস্কারমূলক পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এনবিআরের কাঠামোগত পরিবর্তন, ই-রিটার্ন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণ, কাস্টমস কার্যক্রমে অটোমেশন এবং করের আওতা বৃদ্ধি। এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল দিতে পারে। তবে অধিকাংশ সংস্কার এখনো বাস্তবায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে থাকায় স্বল্প সময়ে উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

সরকার করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। নীতিগতভাবে এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কারণ বিস্তৃত করভিত্তি একটি দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে। তবে এ প্রক্রিয়া কার্যকর করতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জনবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।

নতুন বাজেটে ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসায়ীদের কর ব্যবস্থার আওতায় আনতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন, ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বিআইএন ব্যবহার এবং বিভিন্ন তথ্যভান্ডারের সমন্বয়ের মাধ্যমে করদাতাদের তথ্য যাচাইয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে বাস্তবায়নের সময় ছোট ব্যবসায়ীদের মধ্যে অতিরিক্ত চাপ বা করভীতি তৈরি হলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও মিলতে পারে।

কর আদায়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো করদাতার আস্থা অর্জন। দীর্ঘদিন ধরে জটিল প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং হয়রানির অভিযোগের কারণে অনেকের মধ্যে কর প্রদানে অনীহা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে কর প্রশাসনকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও সেবামুখী করতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের কাছে কর প্রদানের গুরুত্ব এবং করের বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় সেবার বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।

ব্যবসায়ী মহলের আশঙ্কাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। রাজস্ব আদায়ের চাপ যদি অতিরিক্ত হয়, তাহলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। এর প্রভাব বিনিয়োগ, উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানেও পড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সফল বাজেট কেবল বড় অঙ্কের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। তাই রাজস্ব সংগ্রহের পাশাপাশি কর প্রশাসনের সংস্কার, সুশাসন নিশ্চিত করা, করদাতার আস্থা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

সব মিলিয়ে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা যেমন সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, তেমনি এটি বাস্তবায়নে দক্ষ প্রশাসন, কার্যকর সংস্কার এবং স্বচ্ছ নীতিরও বড় পরীক্ষা।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ