🏠︎ » বাংলাদেশ » অপরাধ » বেপরোয়া কিশোর গ্যাং: পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে

বেপরোয়া কিশোর গ্যাং: পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে

দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর অপরাধের বিস্তার এবং অপরাধী চক্রগুলোর বেপরোয়া কর্মকাণ্ড উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার মতো গুরুতর অপরাধে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততার খবর প্রায়ই সামনে আসছে। এর পেছনে রাজনৈতিক কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগও রয়েছে। ফলে কেবল অপরাধে জড়িত কিশোরদের গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; তাদের নেপথ্যের পৃষ্ঠপোষকদেরও চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে বিভিন্ন কিশোর অপরাধী চক্রের কর্মকৌশলেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একসময় কোনো একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আশ্রয়ে থাকা অপরাধীরা পরবর্তী সময়ে পরিচয় ও পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্র পরিবর্তন করে একই ধরনের অপরাধ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের প্রবণতা শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর।

কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে নানা সামাজিক ও পারিবারিক কারণ কাজ করে। পরিবারের পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব, শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়া, বেকারত্ব, দ্রুত অর্থ উপার্জনের আকাঙ্ক্ষা এবং ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। অনেক ক্ষেত্রে এলাকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতার প্রদর্শন কিংবা অপরাধী বড় ভাইদের প্রভাবে কিশোররা গ্যাং সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্র প্রদর্শন ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রচারও তাদের মধ্যে নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি করছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে মাঝেমধ্যে গ্যাং সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হলেও অভিযোগ রয়েছে, এসব অপরাধের নেপথ্যে থাকা মূল হোতা ও প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের অনেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ফলে একজনকে সরিয়ে দিলেও নতুন সদস্য দিয়ে আবারও গ্যাং সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

এই পরিস্থিতিতে কিশোরদের পাশাপাশি অপরাধী চক্রের মূল সংগঠক, অর্থদাতা, ইন্ধনদাতা ও আশ্রয়দাতাদেরও শনাক্ত করা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত যে ব্যক্তিই হোক, তার পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনা নিশ্চিত করতে হবে।

তবে শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে কিশোর অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে এবং তার আচরণে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন হচ্ছে কি না এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া কিশোরদের চিহ্নিত করে কারিগরি শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ তৈরি করা দরকার।

রাজনৈতিক দলগুলোরও নিজেদের সংগঠনে কঠোর শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা উচিত। কোনো অপরাধী যেন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা না পায়, সে বিষয়ে দলীয়ভাবে কঠোর অবস্থান প্রয়োজন। পাশাপাশি পাড়া-মহল্লায় খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সুস্থ বিনোদনের সুযোগ বাড়ানো গেলে কিশোরদের ইতিবাচক কাজে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে।

কিশোর গ্যাং শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও বড় হুমকি। তাই পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ, রাজনৈতিক সংগঠন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। অপরাধী কিশোরদের সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের পেছনে থাকা পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলেই কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার কার্যকরভাবে রোধ করা সম্ভব হবে। নিরাপদ সমাজ ও সুস্থ তরুণ প্রজন্মের স্বার্থে এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

Noxoit Ads

আরও পড়ুন

সর্বশেষ