🏠︎ » সারাদেশ » আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ, মুক্তিযোদ্ধা দলের বিভাগীয় আহ্বায়ককে ঘিরে বিতর্ক

আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ, মুক্তিযোদ্ধা দলের বিভাগীয় আহ্বায়ককে ঘিরে বিতর্ক

আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা এবং একাধিকবার দলটির মনোনয়ন চাওয়ার অভিযোগের মধ্যেই বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন পাবনার প্রকৌশলী ড. মুহাম্মদ ঈসমাইল হোসেন। তাকে ঘিরে এমন রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের অভিযোগে পাবনায় আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। তার নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারাও। বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নজরে আসার পর তার পদ বাতিলের ইঙ্গিত দিয়েছে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।

গত শনিবার (১০ অক্টোবর) পাবনা জেলা পরিষদে কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত উত্তরবঙ্গীয় মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ড. ঈসমাইল হোসেন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার অতীত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের মধ্যেই বিএনপির সহযোগী সংগঠনের বিভাগীয় আহ্বায়ক হিসেবে তার দায়িত্ব পালন নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

দলীয় সূত্র ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন ড. ঈসমাইল হোসেন। স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাবনা-৫ (সদর) আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে তিনি প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছিলেন। এ সময় দলটির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের কথাও জানা গেছে।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, বর্তমানে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের ৩ নম্বর সদস্য হিসেবে ঈসমাইল হোসেনের নাম রয়েছে। দলটির পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ না করে কীভাবে তিনি বিএনপির সহযোগী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিএনপির স্থানীয় পর্যায়েও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা হিসেবে ঈসমাইল হোসেনের পরিচয় নিশ্চিত করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের উপদপ্তর সম্পাদক অ্যাডভোকেট সাবিত ফয়সাল রিজভী। তার দাবি, ড. মুহাম্মদ ঈসমাইল হোসেন কখনো আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেননি।

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঈসমাইল হোসেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথমে উত্তেজিত হয়ে তিনি মামলার হুমকি দেন। পরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা প্রসঙ্গে বলেন, কে বা কারা পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা সদস্যের তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, তা তিনি জানার পর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। ২০২৩ সালের পর থেকে তিনি আর আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত নন বলেও দাবি করেন। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাওয়ার বিষয়টিও অস্বীকার করেন তিনি।

ঈসমাইল হোসেনের এ বক্তব্যের সঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের নেতার দাবির অমিল রয়েছে। ফলে তার পদত্যাগের দাবি এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্যের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা একজন ব্যক্তি বিএনপির সহযোগী সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকায় ক্ষোভ জানিয়েছেন জেলা বিএনপির নেতারা। তাদের বক্তব্য, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশনা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ঈসমাইল হোসেন কীভাবে ওই পদে এলেন, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

পাবনা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নূর মোহাম্মদ মাসুম বগা বলেন, গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগ বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে বলে তারা মনে করেন। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। ঈসমাইল হোসেন কীভাবে ওই পদে এলেন, তা তার জানা নেই উল্লেখ করে বিষয়টি দলীয় ফোরামে জোরালোভাবে উত্থাপনের কথা জানান।

জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবিএম ফজলুর রহমানও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি সব সময় ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন। তার ভাষ্য, জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও দলটির মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে পরিচিত একজন ব্যক্তি কীভাবে বিএনপির সহযোগী সংগঠনের বিভাগীয় পদে দায়িত্ব পেলেন, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

অন্যদিকে, পাবনা জেলা বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট মাসুদ খন্দকার বলেন, মুহাম্মদ ঈসমাইলকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না এবং তার রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কেও অবগত নন। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি দুঃখজনক হবে উল্লেখ করে তিনি খোঁজ নিয়ে দলীয় ফোরামে জানানোর কথা বলেন।

এদিকে বিতর্কটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নজরে আসার পর জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের পক্ষ থেকে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত জানান, ঈসমাইল হোসেনের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে তাদের আগে জানা ছিল না। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইশতিয়াক আজিজ উলফাত বলেন, ড. মুহাম্মদ ঈসমাইলের অতীত রাজনৈতিক পরিচয় তাদের কাছে অজানা ছিল এবং বিষয়টি অপ্রত্যাশিত। তার রাজনৈতিক পরিচয় ও মুক্তিযোদ্ধা সনদের সত্যতা প্রমাণিত হলে তাকে আর মুক্তিযোদ্ধা দলের প্রতিনিধিত্ব করতে দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি। ঢাকায় ফিরে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং পদ বাতিলের নোটিশ জারির কথা উল্লেখ করেন সংগঠনটির এই নেতা।

সব মিলিয়ে ড. মুহাম্মদ ঈসমাইল হোসেনের অতীত রাজনৈতিক পরিচয়, আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং মুক্তিযোদ্ধা সনদের সত্যতা যাচাই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। একদিকে ঈসমাইল হোসেনের পদত্যাগের দাবি, অন্যদিকে জেলা আওয়ামী লীগ নেতার বিপরীত বক্তব্য—এই বিরোধের নিষ্পত্তির পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের ঘোষিত তদন্ত ও সাংগঠনিক পদক্ষেপের দিকে নজর রাখছেন পাবনার রাজনৈতিক অঙ্গনের সংশ্লিষ্টরা।

Noxoit Ads

আরও পড়ুন

সর্বশেষ