রাজবাড়ী প্রতিনিধি :
ইলিশের ভরা মৌসুমেও রাজবাড়ীর পদ্মা নদীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা পাচ্ছেন না জেলেরা। দিনের পর দিন জাল ফেলেও অনেকে ফিরছেন সামান্য মাছ নিয়ে, কেউবা প্রায় খালি হাতে। ফলে নদীতে মাছ ধরার খরচও তুলতে পারছেন না অনেক জেলে। সংসারের ব্যয়, ঋণের কিস্তি ও দাদনের টাকা পরিশোধ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ, পাংশা, কালুখালী ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার বহু মানুষের জীবন-জীবিকা পদ্মার ওপর নির্ভরশীল। ইলিশের মৌসুমে সাধারণত ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নদীতে জাল ফেলতে ব্যস্ত থাকেন জেলেরা। তবে এবার নদীতে সেই ব্যস্ততা থাকলেও নেই প্রত্যাশিত মাছের প্রাচুর্য।
গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ফেরিঘাটসংলগ্ন সাত্তার মেম্বারপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, জেলেদের অনেকেই সামান্য মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরছেন। কেউ কেউ জালে দুই-চারটি ইলিশ পেলেও অনেকের জাল প্রায় খালি থাকছে।
জেলে গোপাল হলদার বলেন, নদীতে পানি কম থাকায় ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। জাল-দড়ি ঠিক করা, নৌকা প্রস্তুত ও জ্বালানি কেনার জন্য ঋণ করতে হয়েছে। কিন্তু মাছ না পাওয়ায় নৌকার খরচও উঠছে না। ৮ থেকে ১০ জন লোক নিয়ে নৌকা চালালেও যা মাছ পাওয়া যায়, তা দিয়ে খাবারের খরচ চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।
আরেক জেলে লাল চাঁদ বলেন, ভরা মৌসুমেও জালে কাঙ্ক্ষিত মাছ উঠছে না। কখনো চার-পাঁচটি, আবার কখনো দুই-একটি মাছ পাওয়া যায়। এতে বাড়িতে টাকা পাঠানোর মতো আয়ও হচ্ছে না। নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনারও দাবি জানান তিনি।
তার ভাষ্য, মাছ না থাকায় অনেক সময় কর্জ-উধার করে সংসার চালাতে হচ্ছে। কোনোদিন ভালো মাছ পেলে এক-দুই হাজার টাকা বাড়িতে পাঠাতে পারেন। নদীর পানি কমে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ায় ইলিশের বিচরণ কমেছে বলেও মনে করেন তিনি।
ইলিশ বিক্রেতা মিলন জানান, গত বছরের তুলনায় এবার ইলিশের পরিমাণ অনেক কম। তার তথ্য অনুযায়ী, পদ্মার এক কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা এবং দেড় কেজি ওজনের ইলিশ প্রায় ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। মাছ কম থাকায় ব্যবসায়ীরাও পর্যাপ্ত মাছ কিনতে পারছেন না।
ইলিশ বিক্রেতা সাইদ অভিযোগ করেন, কিছু অসাধু ব্যক্তি নদীতে বিষ প্রয়োগ ও বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ ধরছেন। এতে মাছের পাশাপাশি ডিম, পোনা ও অন্যান্য জলজ প্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ড বন্ধে কার্যকর নজরদারির দাবি জানান তিনি।
রাজবাড়ী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুব উল হক বলেন, ইলিশ কম পাওয়ার পেছনে একক কোনো কারণকে দায়ী করা যায় না। এর সঙ্গে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বিভিন্ন বিষয় জড়িত থাকতে পারে। শুধু রাজবাড়ী নয়, গত এক-দুই বছর ধরে সারা দেশেই ইলিশের উৎপাদন ও আহরণের প্রবণতা নিম্নমুখী।
তিনি বলেন, জাটকা নিধন, অবৈধ জালের ব্যবহার এবং মা ইলিশের প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরার মতো কর্মকাণ্ড ইলিশের উৎপাদন ও বিচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, ডুবোচর জেগে ওঠা এবং নদীর ওপর বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের মতো কারণও ইলিশের বিচরণ ও প্রজননে প্রভাব ফেলতে পারে।
মৎস্য কর্মকর্তা জানান, ইলিশের উৎপাদন ও বিচরণে প্রভাব ফেলা মানবসৃষ্ট কারণগুলো নিয়ন্ত্রণে মৎস্য বিভাগ কাজ করছে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক কারণগুলোও বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন রয়েছে।
জেলেরা বলছেন, ইলিশের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর জন্য মৌসুমটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে কাঙ্ক্ষিত মাছ না পেলে বছরের বাকি সময় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই পদ্মার পানির স্বাভাবিক প্রবাহ, নদীর নাব্যতা ও ইলিশের প্রজনন-বিচরণক্ষেত্র রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ চান তারা।