🏠︎ » মতামত » জাতিসংঘ কি শুধু বড় হলঘর?

জাতিসংঘ কি শুধু বড় হলঘর?

ট্রাম্পের বক্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক আইন, ভেনেজুয়েলার তেল ও জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বিশ্বের সবচেয়ে বড় বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক মঞ্চ জাতিসংঘ। যুদ্ধ বন্ধ করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো—প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সংস্থাটির অন্যতম ঘোষিত লক্ষ্য।

কিন্তু ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য সেই পুরোনো প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে—শক্তিশালী কোনো রাষ্ট্র সামরিক বিজয়ের পর দুর্বল রাষ্ট্রের সম্পদের ওপর অধিকার দাবি করলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অবস্থান কী?

ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের মার্কিন সামরিক অভিযান এবং পরবর্তী তেল চুক্তির প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার সঙ্গে ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল নিয়ে একটি চুক্তি করেছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলাকে একসঙ্গে ধরে বিশ্বের ৬০ শতাংশের বেশি তেল তাদের হাতে রয়েছে বলে দাবি করেন। বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি বলেন, “To the victor belong the spoils”—অর্থাৎ বিজয়ীরাই যুদ্ধের লুটের মাল পায়।

৬০ শতাংশ তেলের দাবি কতটা সঠিক?

ট্রাম্পের বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলোর একটি হলো বিশ্বের ৬০ শতাংশের বেশি তেল যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার হাতে থাকার দাবি।

তবে এই হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, “বিশ্বের তেল” বলতে মজুত, উৎপাদন নাকি অন্য কোনো পরিমাপক বোঝানো হচ্ছে—তার ওপর ফলাফল ব্যাপকভাবে বদলে যায়। একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সম্মিলিত অংশ প্রমাণিত মজুতের হিসাবে প্রায় ২১.৯ শতাংশ এবং বর্তমান উৎপাদনের হিসাবে প্রায় ২৩.২ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল উৎপাদক। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির গড় অপরিশোধিত তেল উৎপাদন ছিল দৈনিক প্রায় ১৩.৬ মিলিয়ন ব্যারেল।

অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রমাণিত অপরিশোধিত তেল মজুত। মার্কিন EIA-র তথ্যেও দেশটির বিশাল তেল মজুতের বিষয়টি উঠে এসেছে।

অর্থাৎ ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—কিন্তু “৬০ শতাংশ” কথাটি সরাসরি বিশ্বের মোট তেলসম্পদের পরিমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যায় কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।

যুদ্ধের পর সম্পদ কার?

এখানেই ট্রাম্পের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও আইনি প্রশ্নটি তৈরি হয়।

“বিজয়ীরাই লুটের মাল পায়”—এই ধারণা ইতিহাসের বিভিন্ন যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও আধুনিক আন্তর্জাতিক আইন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার বিষয়ে ভিন্ন কাঠামো তৈরি করেছে।

জাতিসংঘ সনদের ২ নম্বর অনুচ্ছেদে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম সমতার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তির আহ্বান জানানো হয়েছে এবং অন্য রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বা শক্তির হুমকি থেকে বিরত থাকার নীতি নির্ধারণ করা হয়েছে।

সুতরাং কোনো সামরিক অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ বিজয়ী রাষ্ট্রের সম্পত্তি হয়ে যায়—এমন সাধারণ নিয়ম জাতিসংঘ সনদে নেই।

বরং প্রশ্নটি দাঁড়ায়, কোন আইনি ভিত্তিতে কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে এবং সেই সম্পদের আয় কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে?

ভেনেজুয়েলা: সামরিক অভিযান থেকে তেল চুক্তি

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন বাহিনীর অভিযানে তৎকালীন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে দেশটির অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক ও জ্বালানি সহযোগিতা নতুন পর্যায়ে যায়।

২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে ট্রাম্প ও ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের বৈঠকও হয়। বৈঠকে জ্বালানি, খনিজ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে রদ্রিগেজ জানান।

এদিকে ট্রাম্পের বক্তব্যে ভেনেজুয়েলার তেলচুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

এখানেই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন—

কোনো দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তার প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত কতটা স্বাধীন এবং কতটা সামরিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার ফল?

তাহলে জাতিসংঘের প্রয়োজন কী?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু “জাতিসংঘ বন্ধ করে দেওয়া উচিত” কিংবা “জাতিসংঘ সব সমস্যার সমাধান করে”—এই দুই চরম অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

জাতিসংঘের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো বিভিন্ন রাষ্ট্রকে একই আলোচনার টেবিলে রাখা। যুদ্ধ, শরণার্থী, মানবিক সংকট, আন্তর্জাতিক আইন, উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, খাদ্য, জলবায়ু এবং নিরাপত্তার মতো বিষয়ে বহুপক্ষীয় আলোচনার একটি কাঠামো তৈরি করা।

কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে জাতিসংঘ সবসময় শক্তিশালী রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে বাধ্য করতে পারে না। নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো, ভেটো ক্ষমতা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে অনেক সংকটে জাতিসংঘের কার্যকর পদক্ষেপ সীমিত হয়ে পড়ে।

তাই সমালোচনার জায়গাটি জাতিসংঘের অস্তিত্ব নয়, বরং তার কার্যকারিতা, জবাবদিহি এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ কতটা সমানভাবে করা সম্ভব—সেই প্রশ্নে।

জাতিসংঘ কি কেবল একটি বড় হলঘর?

জাতিসংঘের সমালোচকেরা প্রায়ই প্রশ্ন করেন—বিশ্বের বড় শক্তিগুলো যদি নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী সামরিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে জাতিসংঘের ক্ষমতা কোথায়?

অন্যদিকে জাতিসংঘের সমর্থকদের যুক্তি হলো—জাতিসংঘ না থাকলে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিয়ে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নিয়মিত আলোচনা, মানবিক সহায়তার সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অনেক কাঠামো আরও দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

অতএব, জাতিসংঘ বিলুপ্ত হলে কী হবে—তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হতে পারে:

জাতিসংঘকে কীভাবে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা যায়, যেখানে রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি নয়, আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপক্ষীয় সিদ্ধান্ত বেশি কার্যকর হবে?

শেষ কথা

ট্রাম্পের ২২ সেপ্টেম্বরের বক্তব্য নতুন করে একটি পুরোনো বিতর্ক সামনে এনেছে—আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তি কি শেষ পর্যন্ত আইনের চেয়ে বড়?

একদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ভেনেজুয়েলায় তাদের পদক্ষেপের মাধ্যমে নিরাপত্তা ও মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে। অন্যদিকে এই সামরিক অভিযান, তেলসম্পদের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ এবং “বিজয়ীর অধিকার” ধরনের বক্তব্য আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

এই বিতর্কের উত্তর কোনো একক ব্যক্তির বক্তব্যে নয়; উত্তর খুঁজতে হবে আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদ, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান এবং বাস্তব ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে।

কারণ জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলা সহজ। কিন্তু জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবে পৃথিবী কী ধরনের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা চায়—সেটিই আসল প্রশ্ন।

Noxoit Ads

আরও পড়ুন

সর্বশেষ