ফুটবল কখনও কখনও সবচেয়ে নিষ্ঠুর। যে খেলোয়াড় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজের পায়ের জাদুতে কোটি কোটি মানুষকে আনন্দ দিয়েছেন, শেষ বিশ্বকাপের শেষ রাতেই তাকেই দেখা গেল অশ্রুসিক্ত চোখে। লিওনেল মেসির কান্নায় যেন স্তব্ধ হয়ে গেল গোটা পৃথিবী। কোটি কোটি ভক্তের হৃদয়ে নেমে এলো এক অদৃশ্য রক্তক্ষরণ।
শেষ বাঁশি বাজতেই মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল পুরো স্টেডিয়ামের চিত্র। কিছুক্ষণ আগেও যে গ্যালারি ছিল উল্লাসে মুখর, সেখানে নেমে এলো পিনপতন নীরবতা। হাজার হাজার আর্জেন্টাইন সমর্থকের চোখে তখন অশ্রু। কেউ মাথা নিচু করে বসে আছেন, কেউ মুখ ঢেকে কাঁদছেন, আবার কেউ শুধু মেসির নাম ধরে চিৎকার করছেন। মনে হচ্ছিল, বিদায় নিচ্ছেন শুধু একজন ফুটবলার নন—বিদায় নিচ্ছে ফুটবলের এক সোনালি যুগ।

এই বিশ্বকাপে মেসির সামনে ছিল একসঙ্গে একাধিক ইতিহাস গড়ার হাতছানি। স্বপ্ন ছিল ফুটবলের কালোমানিক পেলের পর টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়কদের কাতারে নিজের নাম লেখানো। আর একটি জয় পেলেই ইতিহাসের সেই বিরল সম্মান অর্জন করতেন তিনি।
শুধু তাই নয়, ব্যক্তিগত অর্জনের লড়াইটাও ছিল সমান উত্তেজনাপূর্ণ। গোল্ডেন বুট জয়ের দৌড়ে ছিলেন অন্যতম দাবিদার। বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে ওঠার সম্ভাবনাও ছিল তাঁর সামনে। ফাইনালে গোল করলে আরও কিছু ঐতিহাসিক রেকর্ড নিজের করে নেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু ফুটবল সবসময় রূপকথার সমাপ্তি লেখে না।
বিশ্বকাপজুড়ে নেতৃত্ব, গোল, অ্যাসিস্ট ও দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে আবারও প্রমাণ করেছিলেন কেন তাঁকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার বলা হয়। ছয়টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ, বিশ্বকাপে সর্বাধিক ম্যাচ খেলার কীর্তি, অধিনায়ক হিসেবে সর্বাধিক ম্যাচ, বিশ্বকাপের বিভিন্ন আসরে গোল করার অনন্য ধারাবাহিকতা—অসংখ্য রেকর্ড ইতোমধ্যেই তাঁর ঝুলিতে। তবুও শেষ ফাইনালের পরাজয় যেন সব আনন্দকে ম্লান করে দিল।

মেডেল গ্রহণের সময় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলেন মেসি। চোখের জল লুকানোর চেষ্টা করেও পারেননি। সেই অশ্রুসিক্ত মুখ মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় একটাই বাক্যে—”আজ কাঁদছে শুধু মেসি নয়, কাঁদছে পুরো ফুটবল বিশ্ব।”
ট্রফি হয়তো শেষবারের মতো ছুঁতে পারলেন না। হয়তো কিছু স্বপ্ন অপূর্ণই রয়ে গেল। কিন্তু ইতিহাস কখনও শুধু একটি ম্যাচ দিয়ে লেখা হয় না। রেকর্ড ভাঙতে পারে, নতুন চ্যাম্পিয়ন আসতে পারে, কিন্তু কোটি মানুষের হৃদয়ে লিওনেল মেসির যে স্থান, তা কখনও মুছে যাবে না।

শেষ বিশ্বকাপে ট্রফি নয়, অশ্রু নিয়েই বিদায় নিলেন তিনি। কিন্তু ভালোবাসায়, শ্রদ্ধায় আর কিংবদন্তির মর্যাদায়—লিওনেল মেসি চিরকাল থাকবেন ফুটবল ইতিহাসের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র হয়ে।