🏠︎ » খেলাধুলা » ফুটবল » অপূর্ণ স্বপ্ন নিয়েই ব্রাজিলের দুঃখী রাজপুত্রের মুকুটহীন বিদায়

অপূর্ণ স্বপ্ন নিয়েই ব্রাজিলের দুঃখী রাজপুত্রের মুকুটহীন বিদায়

নিয়তি কখনও কখনও অবিশ্বাস্যভাবে একটি গল্পের শুরু আর শেষকে একই জায়গায় এনে দাঁড় করায়। প্রায় ১৬ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই ব্রাজিলের জার্সিতে আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রথম পা রেখেছিলেন এক ঝাঁকড়া চুলের কিশোর। সেই প্রথম স্পর্শেই বিশ্ব চিনেছিল এক অনন্য প্রতিভাকে। আর ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে, একই দেশের মাটিতে, শেষ বাঁশির সঙ্গে শেষ হয়ে গেল তার বিশ্বকাপের আরেকটি স্বপ্ন। যেন যেখানে শুরু হয়েছিল রূপকথা, সেখানেই লেখা হলো তার সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়।

ব্রাজিলের বিদায়ের পর নেইমারের কণ্ঠে ভেসে এলো এক বিষণ্ন স্বীকারোক্তি এটাই হয়তো জাতীয় দলের হয়ে তার শেষ ম্যাচ। মাত্র ৩৪ বছর বয়সেই এমন ইঙ্গিত অনেককেই বিস্মিত করেছে। কারণ একই সময়ে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো ফুটবলাররা এখনও আন্তর্জাতিক ফুটবলে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু নেইমারের ক্যারিয়ার ছিল ভিন্ন এক গল্প বারবার চোট, দীর্ঘ পুনর্বাসন, প্রত্যাবর্তনের সংগ্রাম এবং প্রত্যাশার অসহনীয় চাপের গল্প।

২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬ টানা চারটি বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে ষষ্ঠ শিরোপা এনে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন তিনি। কিন্তু প্রতিবারই কোনো না কোনো বাধা তার পথ আটকে দিয়েছে। কখনও ভয়াবহ ইনজুরি, কখনও ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, কখনও আবার হতাশাজনক বিদায়। বিশ্বকাপ তার জন্য হয়ে উঠেছে অসমাপ্ত স্বপ্নের আরেক নাম।

নেইমারের ক্যারিয়ার শুধু প্রতিপক্ষের কঠোর ট্যাকলের বিরুদ্ধে লড়াই নয়, ছিল সমালোচনার বিরুদ্ধেও এক দীর্ঘ সংগ্রাম। তার দক্ষতার প্রশংসার পাশাপাশি তাকে শুনতে হয়েছে নাটুকেপনার অভিযোগও। অনেক সময় পুরো দলের সাফল্য-ব্যর্থতার দায়ও এসে পড়েছে তার একার কাঁধে। প্রত্যাশার সেই পাহাড় তিনি অনেকবারই একা বয়ে বেড়িয়েছেন।

বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে নেইমারের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে তিনি পেছনে ফেলেছেন পেলের মতো কিংবদন্তিকেও। ২০১৩ সালের কনফেডারেশনস কাপ জয়ে ছিলেন দলের প্রাণভোমরা। ২০১৬ সালে মারাকানায় ব্রাজিলকে এনে দেন ইতিহাসের প্রথম অলিম্পিক ফুটবল স্বর্ণপদক। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার প্রভাব শুধু পরিসংখ্যানেই নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্মের অনুপ্রেরণায়ও অমলিন হয়ে থাকবে।

চারটি বিশ্বকাপ যেন নেইমারের জীবনে চারটি ভিন্ন ট্র্যাজেডি হয়ে এসেছে। ২০১৪ সালে হুয়ান জুনিগার ট্যাকলে পিঠের গুরুতর চোট তাকে সেমিফাইনালের আগে ছিটকে দেয়। ২০১৮ সালে পূর্ণ ফিটনেস ফিরে না পাওয়ার লড়াইয়ের মধ্যেই শেষ হয় অভিযান। ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে অসাধারণ গোল করেও টাইব্রেকারের নিষ্ঠুরতায় থেমে যায় স্বপ্ন। আর ২০২৬ সালে আবারও বিশ্বকাপ শেষ হয় শূন্য হাতে।

ফুটবল ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তি আছেন, যাদের সাফল্য ট্রফিতে মাপা যায়। আবার কিছু কিংবদন্তি আছেন, যাদের উত্তরাধিকার গড়ে ওঠে প্রতিভা, শিল্প, আবেগ এবং অসমাপ্ত স্বপ্নের ওপর। নেইমার সেই দ্বিতীয় দলের একজন। তার ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপ ট্রফি না থাকলেও, ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সৌন্দর্য, সৃজনশীলতা ও সাহসের প্রতীক হয়ে তিনি চিরকাল স্মরণীয় থাকবেন।

হয়তো তার হাতে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি ওঠেনি। কিন্তু কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে তিনি থেকে যাবেন সেই মুকুটহীন রাজপুত্র হিসেবেই যার গল্পে আনন্দের চেয়ে বেদনা বেশি, তবু যার নাম উচ্চারিত হবে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর এক চিরন্তন আক্ষেপ নিয়ে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ